AGUNER BARNAMALA by Drishyopot

আপনি কি স্বপ্ন দেখেন, আগুনের স্বপ্ন? আপনি কি দেখতে পান আপনাকে ঘিরে ধরছে আগুন – কিভাবে ঘিরে ধরছে…কি রূপে ঘিরে ধরছে…দেখতে পান? বুঝতে পারেন? কি হবে জীবনের কোন এক মুহূর্তে যখন আপনি আশ্রয় খুঁজছেন, আশ্রয়দাতা হিসাবে যদি দেখতে পান আগুনকে? কিভাবে আছে আগুন? কোথায় আছে আগুন? কিংবা, কোথায় নেই?

দৃশ্যপট-এর “আগুনের বর্ণমালা” দেখতে যাবার আগে এত সব প্রশ্নের একটাও আমার মনে এসেছিল যদি বলি, তবে তা হবে ডাহা মিথ্যে কথা। আর পাঁচটা নাটক দেখতে যাবার মতনই হাল্কা মনে ঢুকেছিলাম শেষ বিকেলে আকাদেমিতে। সন্ধ্যা পেরিয়ে যাবার পর যখন বেরোলাম নাটক দেখে, তখন যে মনে এমন তোলপাড় হতে পারে, তা আগে ভাবিনি।

কি আছে এতে এমন চমকে দেবার মতন? সাধারণই এক গল্প। বছর ষোলোর কিশোর কুশলকে ম্যাজিস্ট্রেট অর্চনা তার বন্ধু জেলের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অনির্বাণের কাছে আনবার আর্জি জানাতে আসে। ছেলেটি তার বাবাকে বিছানার সঙ্গে বেঁধে আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে মেরেছিল। এমন নৃশংস হত্যার আসামী কোর্টে মামলা চলাকালীন শুধু টিভির বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলস্‌ গেয়ে গেছে। তাকেই বাঁচাতে অনির্বাণের দ্বারস্থ অর্চনা। খানিক দ্বিধার পরে অনির্বাণ বাধ্য হয় তাকে দেখবে বলে অর্চনাকে কথা দিতে। তার জীবন বদলে দেবার আশায় কুশলকে অনির্বাণ নিয়ে আসে নিজের কাছে।

আর এতেই বদলে যেতে থাকে অনির্বাণের জীবন। ক্রমে ক্রমে আগুন তার নানান রঙ, নানান রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে আগুন অনির্বাণের চোখের সামনে। চোখের আগুন, মনের আগুন, পেটের আগুন। কুশল তাকে দাঁড় করিয়ে দেয় বহু প্রশ্নের সামনে।

অনির্বাণ ক্রমে জানতে পারে অনেক তথ্য – জানতে পারে, কুশলের পরিবারের গৃহদেবতা অগ্নি; তার মা মারা গিয়েছিলেন আগুনে পুড়ে, স্কুল থেকে ফিরে কুশল দেখেছিল, আগুনে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া তার মায়ের শরীর; তার ঠাকুমার কাছে কুশল সবচেয়ে শুনতে পছন্দ করে খান্ডবদাহনের গল্প, সেই গল্প যেখানে আগুনও আশ্রয় দেয় পক্ষীশিশুদের। কুশলের প্রিয় জায়গা ছিল রেল ইয়ার্ডের পাশের এক পরিত্যক্ত খালপাড় এবং তার পাশের ভাঙা শিবমন্দির। সেখানেই সে গিয়ে গেরুয়া বসন পরিহিত হয়ে অগ্নিস্তব করত। পাড়ার মেয়ে দোলাকে পড়াত কুশল। একদিন তাকে নিয়েই সেখানে যায় কুশল – কিন্তু ছুঁতেও পারে না সে দোলাকে। তার সমস্ত কাজের মাঝেই এসে পড়ে আগুন – এসে পড়া তার মায়ের আগুনে পোড়া কালো শরীর। আর কুশলকে মোহিত করে তার গ্রামের বাড়িতে গাজনের সময়ে সন্ন্যাসীদের খালি পায়ে আগুনের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া। সেও চেষ্টা করে, কিন্তু পায়ে ফোস্‌কা পড়ে যায় তার।

অথচ কুশল নিশ্চিত জানে যে সৎ, যে সত্যবাদী এবং যে পিতৃভক্ত তাকে আগুন স্পর্শ করে না। সমগ্র বিশ্বের অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে পিতৃভক্ত কুশলের একমাত্র আশ্রয় তার বাবা – যিনি ছুটির দিনেও কারখানায় মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে ঘাম ঝরান, যাতে কুশল স্বচ্ছল ভাবে থাকতে পারে। সেই আশ্রয়ও যখন ধ্বংস হয়ে যায়, তখন কুশলের সামনে একটিই রাস্তা খোলা থাকে। সে পরীক্ষা নিতে চায় – যে নিজেকে সৎ, পরিষ্কার বলত, তার সেই বাবাকে আশ্রয় দেয় কিনা আগুন। তাই তার বাবাকেই সে দাঁড় করায় আগুনের সামনে, সুযোগ রাখে না আত্মরক্ষারও।

কুশলের আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে অনির্বাণও যেন খুঁজে পেতে থাকে তার ভিতরের পুরোনো লুকিয়ে পড়া আগুনকে। সামনে আসতে থাকে বাংলার ইতিহাসের এক বিশেষ রাজনৈতিক অধ্যায়, যখন সমগ্র জাতি নকশালবাড়ির আন্দোলনকে সামনে রেখে দাঁড়িয়েছিল আগুনের সামনে। অনির্বাণের মনের গোপন কোণ থেকে সামনে চলে আসতে থাকে বড়োতীর বিলের স্তব্ধ জলের নীচে কোন এক নির্জন রাতে লুকিয়ে পড়া আগুন।

অনির্বাণ বুঝতে পারে, অর্চনা বা সাধারণ লোকজনের আশা, সে কুশলের ভিতরের আগুনটা কেড়ে নিয়ে তাকে সমাজের জন্য নিরাপদ এক মানুষ বানিয়ে দেবে, যার জীবন বাঁধা থাকবে দশটা পাঁচটার ঘড়ির কাঁটায়।

অনির্বাণের ভূমিকায় শ্রীদেবশঙ্কর হালদারকে অসাধারণ বললেও কমই বলা হয়। কিন্তু তাঁর সঙ্গে একই রকম পাল্লা দিয়ে অভিনয় করলেন কুশলের ভূমিকায় শৌণক সান্যাল। এছাড়াও অর্চনার ভূমিকায় রীতা দত্তচক্রবর্তী যথাযথ। ছোট ভূমিকায় চোখে পড়ার মতন অভিনয় করলেন রেলইয়ার্ডের অবাঙালী যাযাবর, কুশলের বাবার ও ঠাকুর্দার ভূমিকায় যে অভিনেতারা অবতীর্ণ হলেন তাঁরা। কুশলের মা ও ঠাকুমা এবং দোলার ভূমিকায় যে অভিনেত্রীরা অভিনয় করলেন, প্রশংসা প্রাপ্য তাঁদেরও। আর বিশেষ প্রশংসা অবশ্যই প্রাপ্য নাট্যকার হর ভট্টাচার্য্যের এবং নির্দেশক অনির্বাণ ভট্টাচার্য্যের।

এই নাটক দেখতে দেখতে অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম এই ভেবে, কেমন করে চতুর্দিক থেকে আগুনেরা ঘিরে রয়েছে আমাদের। যে আগুনের খোঁজ আমরা করি না, আমরা জেনেও জানতে পারি না। কিন্তু সত্যিকারের আগুন হয়তো কখনো চেপে রাখা যায় না। স্বেচ্ছায় সেই আগুনে পুড়তে থাকে কুশল। সেই আগুনকে বশে রাখতে গেলে পুড়ে যেতে হয় কুশলের বাবাকে, সেই আগুনেই হাত রাখতে হয় অনির্বাণকে। দর্শকাসনে বসে যেন বুঝতে পারি, দর্শকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে সেই আগুনের আঁচ।

রাতে বাড়ি ফিরেও যেন মনের মধ্যে বাজতে থাকে – “জয় আগুনের জয়, আগুনে হলো আগুনময়…”।

Advertisements

2 thoughts on “AGUNER BARNAMALA by Drishyopot

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s